HISTORY
ইসলামিক ইতিহাস
Baha-ul-lah: বাবীবাদ থেকে বাহাই ধর্মমতের বিকাশ
বাহাউল্লাহ বর্তমান ইরানের তেহরানের মাজান্দারান নগরে ১২ই নভেম্বর, ১৮১৭ সনে এক উচ্চ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম মির্জা হুসেইন আলী নূরী। নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা করার পর তিনি 'বাহাউল্লাহ' এই আরবী উপাধিটি ধারণ করেন, যার অর্থ 'গ্লোরী অফ গড' বা খোদার মহিমা। তার অনুসারীরা দাবী করেন তিনি ইব্রাহিমের শেষ বয়সে বিবাহ করা স্ত্রী কাটুরার বংশজাত। তার পিতা ছিলেন মির্জা বুজুর্গ (Mírzá Buzurg) এবং মাতা খাদিজা খানম (Khadíjih Khánum)। মির্জা বুজুর্গ প্রথমে ফতেহ আলী শাহ কাজর এর দ্বাদশ সন্তান ঈমাম-ভার্দি মির্জার প্রধানমন্ত্রী (Vizier) ছিলেন। অত:পর তিনি বুরুজার্ড (Burujird)ও লরেস্তান (Lorestan)এর গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৮৩৪ সনে শাহ-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহম্মদ শাহ ক্ষমতায় এলে তিনি পদচ্যূত হন।
![]() |
| শিরিন অব বাহা, আক্কা। |
পিতা মির্জা বুজুর্গ এর মৃত্যুর পর তৎকালীন মন্ত্রী হাজী মির্জা আকাসী বাহাউল্লাহকে একটি সরকারী পদ গ্রহণের জন্যে অনুরোধ করেন, বাহাউল্লাহর অস্বীকৃতিতে তা পরিত্যক্ত হয়। এসময় মন্ত্রী বাহাউল্লাহর নিজস্ব সম্পত্তি মাজান্দারান নগরের নূরী গ্রামের একটা অংশ হুকুম দখল করতে চাইলেন। কিন্তু বাহাউল্লাহ তা রাষ্ট্রের কাছে বিক্রী করতে অস্বীকৃত হলে মন্ত্রী মির্জা আকাসী ও তার মধ্যে এক বড় ধরণের তিক্ততার সূত্রপাত হল।
![]() |
| শিরিন অব বাব, হাইফা। |
এদিকে ১৮৪৪ সনে সিরাজ নগরের ২৫ বৎসর বয়স্ক সৈয়দ মির্জা আলী মুহম্মদ নামক এক ব্যক্তি বাব (Bab) বা গেট (Gate) উপাধি ধারণ করে নিজেকে প্রতিজ্ঞাত মেহেদী বলে দাবী করলেন। বাব ঘোষণা করলেন তিনিই শেষ নন, তারপরে আসবেন 'প্রতিজ্ঞাত জন' যার কথা পাক কিতাবসমূহে আছে, যিনি পৃথিবীতে খোদায়ী রাজ্য স্থাপন করবেন। বাব তার লেখাসমূহে জানিয়েছিলেন যে, প্রতিজ্ঞাত জনের আগমন শীঘ্রই হবে। এ কারণে তার কোন উত্তরাধিকারী থাকবে না, যতক্ষণ না তিনি আসেন। তবে তিনি তার পরে তার আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্যে সাধারণ নেতা হিসেবে মির্জা ইয়াহিয়া (Mírzá Yahyá) নামক এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বাব তার অনুসারীদের এ নির্দেশও দিয়েছিলেন যে, যখন সেই প্রতিজ্ঞাত জন আসবেন তখন যেন তারা তাকে অনুসরণ করে।
| বাহাই টেম্পল সিডনি। |
১৮৪৮ সনে বাহাউল্লাহ খোরাসানে বাবীদের এক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে ৮১জন বাবী নেতা ২২ দিনের জন্যে একত্রিত হয়েছিলেন। ঐ সম্মেলনে বাবীদের মধ্যে যারা ইসলামিক আইন মেনে চলতে চায় ও যারা মনে করে বাবের বাণী একটি নূতন খোদায়ী দিকনির্দেশনার নির্দেশ, এ দু’য়ের মাঝে বিষয়টির উপর দীর্ঘ আলোচনা চলেছিল। বাহাউল্লাহ বাবের দিকটি সমর্থন করেন এবং ভোটাভুটিতে জয়লাভ করেন। এই সম্মেলনেই তিনি 'বাহা' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
১৮৪৮ সনের শেষদিকে বাবী সম্প্রদায় ও কাজার সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে বাহাউল্লাহ নির্যাতিত বাবীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তেহরান থেকে মাজান্দারানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু তিনি সেখানে যাবার আগেই আটক ও কারাবন্দী হলেন।১৮৫০ সনে বাবী আন্দোলন পারস্যের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়লে বাবী ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত হল। এরই ফলশ্রুতিতে ঐ সনেই বাবকে বন্দী করে তিবরিজের উন্মুক্ত ময়দানে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হল। তার লাশ তার অনুসারীরা প্রথমে তেহরানে ও পরে ইজ্রায়েলের হাইফাতে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করে। এটি বর্তমানে শিরিন অব বাব নামে পরিচিত।
![]() |
| লোটাস টেম্পল দিল্লী। |
![]() |
| বাহাই মন্দির ইলিয়ন, USA |
বাহাউল্লাহ বলেন তেহরানের শিয়াচল বা অন্ধকূপের ঐ বন্দী জীবনে তার বেশকিছু অতিপ্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা হয়। দিব্য-দর্শনে তার নিকট এক স্বর্গীয় হুরীর আগমন হয়, যে তাকে অবহিত করে যে তিনিই সেই প্রতিজ্ঞাত জন যার সত্ত্বর আগমন সম্পর্কে বাব ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন।
বাহাউল্লাহকে রুশ দূতাবাস তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে ৮ই এপ্রিল, ক্ষত-বিক্ষত, অসুস্থ্য শরীর নিয়ে ১৮৫৩ সনে চলে এলেন বর্তমান ইরাকের বাগদাদ নগরে। এই প্রাচীন নগরীটি তখন ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন। এদিকে বাহাউল্লাহকে বাগদাদে নির্বাসিত করা হয়েছে জানতে পেরে মির্জা ইয়াহিয়া সেখানে যাবার মনস্থ করলেন। শাহকে হত্যার পরিকল্পণা ব্যর্থ হবার পর ব্যাপকভাবে বাবীদেরকে ধরপাকড়ের সময় তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। যাহোক, এসময় অন্যান্য বাবীরাও যারা পারস্যে বিশেষভাবে নির্যাতিত হচ্ছিল, তারাও এখন একে একে বাগদাদে বাহাউল্লাহর চারিপাশে এসে ভীড় করল।
মির্জা ইয়াহিয়া বাগদাদে এসে বাবী সম্প্রদায়ের মাঝে বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালেন এবং সম্প্রদায়কে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেললেন। নিজ সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেকে বিরোধের উৎস হিসেবে দেখতে পেয়ে বাহাউল্লাহ একাকীত্বের জীবন বেঁছে নিলেন এবং পরিবারের ভার তার ভ্রাতা মির্জা মূসার হাতে অর্পণ করে, একজন মাত্র সাথীসহ কুর্দিস্থানে চলে গেলেন। বাহাউল্লাহ বাগদাদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সুলাইমানিয়া শহরের নিকট কুর্দিস্থানের পাহাড়ের দিকে গমন করেছিলেন।
| বাহাই টেম্পল, ডয়েসল্যান্ড। |
এদিকে বাগদাদে মির্জা ইয়াহিয়ার দূর্বল নেতৃত্বের কারণে বাবী সম্প্রদায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে লাগল। এসময় বাহাউল্লাহর পরিবারসহ কিছু বাবী দিকনির্দেশনার জন্যে বাহাউল্লাহকে খুঁজে ফিরতে থাকে। তারপর যখন দরবেশ মুহম্মদ নামধারী একজন লোকের পাহাড়ে বসবাসের সংবাদ আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাহাউল্লাহর পরিবার তাকে বাগদাদে ফিরে আসার জন্যে বিনীত অনুরোধ করল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯শে মার্চ, ১৮৫৬ সনে দু’বৎসর কুর্দিস্থানে কাটানোর পর তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন।
বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে ভগ্নহৃদয় ও বিভক্ত দেখতে পেলেন। তার অনুপস্থিতে মির্জা ইয়াহিয়ার স্বৈরাচারী পলিসি ও কার্যকরী যোগ্য নেতৃত্ব দানের অক্ষমতাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। মির্জা ইয়াহিয়া বাবের পরিস্কার নির্দেশের বিরুদ্ধে তার দু’জন বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন; শাহকে দ্বিতীয়বার হত্যা প্রচেষ্টার পর নূর প্রদেশের বাবীদেরকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন; এমনকি তার নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের প্রতি তিনি ত্রাস সৃষ্টিও করেছিলেন যা সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছিল।
এ কারণে বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করলেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং লেখনীর দ্বারা বাবী ধর্ম সম্পর্কে তাদের মাঝে নূতন উপলব্ধি ও প্রেরণার সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য ও তিনি যে বাবের সেই প্রতিজ্ঞাত জন, এ বিষয়টি সম্পূর্ণ উহ্য রাখলেন। তথাপি শীঘ্রই তিনি বাবীদের মাঝে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের নিকট চিহ্নিত হয়ে গেলেন আগামীদিনের বাবী নেতা হিসেবে। এসময় তিনি সরকারী কর্মকর্তা ও সুন্নী আলেমদের নিকট থেকে সহানুভূতি লাভ করেছিলেন।
![]() |
| বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান, বাগদাদ। |
সরকারী নির্দেশের পর, ১৮৬৩ সনের ২১শে এপ্রিল বাহাউল্লাহ বাগদাদ ত্যাগ করলেন এবং বাগদাদের নিকটবর্তী নাজিবিয়া উদ্যানে প্রবেশ করলেন। বর্তমানে এটির নাম 'বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান'। বাহাউল্লাহ ও তার সঙ্গীরা কনস্টানটিনোপলে যাত্রার পূর্বে সেখানে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ই বাহাউল্লাহ তার সঙ্গী, ক্ষুদ্র এক দলের নিকট একজন 'খোদার দূত' (Messenger of God) হিসেবে তার উদ্দেশ্য ও অবস্থান ঘোষণা করেন। এ কারণে বাহাই সম্প্রদায়ের নিকট এই সময়কালটা বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ এবং তারা এর স্মরণে ১২ দিন ধরে ঐ উদ্যানে 'রিদভ্যানের উৎসব' (Festival of Ridván)পালন করে থাকে।
বাহাউল্লাহ যখন দাবী করেছিলেন যে তিনি শিয়াচলে স্বর্গীয় অপ্সরীর দেখা পেয়েছিলেন এবং রিদভ্যানের উদ্যানে তার ঘোষনা Ayyam-i Butun বা "Days of Concealment" এর মধ্যবর্তী সময়কালকে দূতীয় গোপনীয়তার সময়কাল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন যে, এই সময়কালটা ছিল একটা "Set Time of Concealment"। রিদভ্যানের উদ্যানের ঘোষণা ছিল বাবী সম্প্রদায়ে একট নূতন ধাপের শুরু যা বাবীবাদ (Bábísm) থেকে পৃথক করেছে বাহাই ধর্মমত বা বিশ্বাসের (Bahá'í Faith) উত্থানকে একটি স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে।
৩রা মে, ১৮৬৩ সনে বাহাউল্লাহ পরিবার এবং অনুসারীদের এক বিরাট দল নিয়ে রিদভ্যানের উদ্যান থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৭ই অগাস্ট, ১৮৬৩ সনে কনস্টানটিনোপলে পৌঁছেন। এই যাত্রায় তিনি যে শহরেই পা রেখেছেন, সেখানেই সমাদর ও সম্মানের সাথে আপ্যায়িত হয়েছেন। এমনকি কনস্টানটিনোপলে পৌঁছিলে তিনি রাজকীয় অতিথীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। তবে অটোম্যান কর্তৃপক্ষ কেন তাকে পারস্যে ফেরৎ না পাঠিয়ে কনস্টানটিনোপলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। কারণটা হয়ত: রাজনৈতিক ছিল, কেননা বাহাউল্লাহ ইতিমধ্যে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন অপরকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সম্পন্ন একজন মানুষ রূপে।
![]() |
| বাহাউল্লাহর নির্বাসন পথের ম্যাপ। |
যাইহোক, কর্তৃপক্ষের আদেশমত বাহাউল্লাহ তার পরিবার ও অনুসারীসহ ১লা ডিসেম্বর, ১৮৬৩ সনে আদ্রিয়ানোপলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ১২ই ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছেন। এই যাত্রা ভ্রমনের ছিল না, ছিল নির্বাসনের। বাহাউল্লাহ এখানে সাড়ে চার বৎসর অবস্থান করেন। এখানে অবস্থান কালে মির্জা ইয়াহিয়া তাকে হত্যার কয়েকটি পরিকল্পনা করেন। কেননা বাবী সম্প্রদায়ে বাহাউল্লাহর উত্থান ক্রমাগত তার নেতৃত্বের অবস্থান নিম্নগামী করছিল। এই কাজে প্রথমে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন স্থানীয় একজন নাপিতকে। এই নাপিত মুহম্মদ আলী ছিল ইস্পাহানের অধিবাসী। কিন্তু নাপিত মির্জা ইয়াহিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয়। পরবর্তীতে মির্জা ইয়াহিয়া ওস্তাদ মুহম্মদ আলী-ই সালমানীর সহযোগীতায় তাকে স্নানের সময় হত্যার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হলে তিনি বিষ প্রয়োগে তাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালান এবং আংশিক সফল হন। বিষের ক্রিয়ায় বাহাউল্লাহর স্নায়ূ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় পরবর্তী জীবন তাকে হস্ত কস্পন (Shaking Hand) নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
![]() |
| বাহাউল্লাহর আক্কার কারাগার। |
বাহাউল্লাহ তার কয়েকজন অনুসারীকে ইরাক ও ইরানের বাবীদের মাঝে তার দাবী সম্বলিত বাণী পৌঁছানোর জন্যে নির্দেশ দিলেন যারা তার বক্তব্য শুনতে পারেনি। তিনি তাদেরকে আরও বলে দিলেন তারা যেন সকল বাহাইকে একত্রিত ও পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে তার আদেশ জানিয়ে দেন। এই সময়কালে বাহাউল্লাহ স্বতন্ত্র্যভাবে বাহাই বিশ্বাস ও অনুশীলনী সম্পর্কে লেখার কাজে হাত দেন।
এরপর বাহাউল্লাহ তার দাবীকৃত বাহাই বিশ্বাস গ্রহণ করতে, দৃশ্যমান বিরোধগুলো নিস্পত্তিতে একত্রে কাজ কাজ করার আশ্বাস দিয়ে এবং মানুষের জন্যে এ পৃথিবীকে বেহেস্তী রাজ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় তার সাথে শামিল হতে বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও রাজ-রাজড়াদের প্রতি আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। তার প্রথম পত্র (Tablet of the Kings) প্রেরিত হয়েছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান আব্দুল আজিজ ও তার সভাষদদের প্রতি।পরবর্তীতে আক্কাতে পৌঁছে তিনি যাদের নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-
২. ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান ৩য়।
৩. রূশ সম্রাট আলেকজান্ডার ২য়।
৪. প্রুশিয়ার রাজা উইলহেম ১ম।
৫. আয়ারল্যান্ড ও বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়া।
৬. অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ।
৭. পার্স্যিয়ান সম্রাট নাসির উদ্দিন শাহ।
৮. আমেরিকার শাসক ও সেখানকার প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট।
বাবী সম্প্রদায়ে এখন বাহাউল্লাহ ও মির্জ ইয়াহিয়ার মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে দেখা দিল। কোনভাবেই এই বিভক্তি দূর করার আর কোন পথ খোলা ছিল না। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীরা বাহাউল্লাহকে হেয় করতে তার বিরুদ্ধে এক গুরুতর অভিযোগ এনে অটোম্যান কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ দায়ের করলেন। বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র ও স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসময় সরকার তাদের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং দেখতে পেলেন যে বাহাউল্লাহ এবং মির্জা ইয়াহিয়া উভয়ে এক নূতন ধর্মীয় দাবী ছড়িয়ে দিচ্ছেন যা মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।এতে সরকার আশঙ্কা করলেন আগামীতে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি হতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষ তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে পুনরায় তাদের উভয়কে অটোম্যান সাম্রাজ্যের দুই প্রান্তে কারাদন্ডসহ নির্বাসনে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৮৬৮ সনের জুলাই মাসে এ সম্পর্কিত রাজকীয় ফরমান জারী হল। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীদেরকে সাইপ্রাসের ফামাগুস্তা (Famagusta) এবং বাহাউল্লাহ ও তার অনুসারীদেরকে প্যালেস্টাইনের আক্কাতে (Akka) নির্বাসনের আদেশ হয়েছিল।
| বাহাই গার্ডেন আক্কা। |
১ম বৎসরের বন্দী জীবন বাহাইদের খুবই কষ্টে কাটল। কয়েকজন মারাও গেল, যাদের মধ্যে ছিল বাহাউল্লার ২২ বৎসরের পুত্র মির্জা মেহেদী। সে প্রার্থনা ও ধ্যানের সময় স্কাইলাইট দিয়ে নীচে পড়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে কারাকর্মকর্তারা বাহাউল্লাহকে সম্মান ও বিশ্বাস করতে শুরু করলে অবস্থার উন্নতি হল। তারপর সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি শহর ত্যাগ ও আশেপাশের এলাকায় যাবার অনুমতিও পেলেন।
১৮৭৭ থেকে ১৮৭৯ সন পর্যন্ত বাহাউল্লাহ মাজরাহির একটি বাড়ীতে ছিলেন। তারপর তার শেষ বৎসরগুলো (১৮৮৯ সন থেকে বাকী জীবন) কাটে বাহজি ম্যানসনে-আক্কার সীমান্তলগ্ন স্থানে।যদিও তিনি তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আটোম্যান শাসকের অধীনে কারাবন্দীই ছিলেন।
৯ই মে, ১৮৯২ সনে বাহাউল্লাহ সামান্য জ্বরে পড়েন।পরবর্তীতে তার শারিরীক অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং ২৯শে মে, ১৮৯২ সনে তিনি পরলোকগমন করেন। তাকে বাহাজি ম্যানসনের পাশেই অন্তিম শয়নে শায়িত করা হয়।
বাহাউল্লাহ নিজেকে সকল ধর্মের বিশ্বাসীদের নিকট 'প্রতিজ্ঞাত জন' হিসেবে তুলে ধরেছেন (এখানে উল্লেখ্য যদিও তিনি কখনও বলেননি যে, তিনি হিন্দুদের 'কলি অবতার' বা বৌদ্ধদের 'মৈত্রীয়', কিন্তু তার লেখনীর মধ্যে তা প্রকাশ পেয়েছে)। তার শিক্ষা ছিল মূলত: খোদা একজনই; সকল ধর্মই তাঁর নিকট থেকে এসেছে; এখন সময় এসেছে মানবতার স্বার্থে সকলে এক হবার, যেন খোদার অভীষ্ট পূরণে সকলে মিলে এক বেহেস্তী রাজ্য গঠন করা যায়।
সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.
ছবি: Wikipedia.









0 Comments: