Headlines
Loading...


 বাপি চলো…আমরা কি এখানে বসে থাকবো নাকি।


সবাই নেবে যাক…ওরা আমাদের কামরার কাছে আসবে বলেছে…

জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে লোকজনের যাওয়া আসা দেখছি…সারা প্ল্যাটফরম টা লোকে গিজগিজ করছে…তার মাঝখান দিয়ে দুজনকে আমাদের কামরার দিকে আসতে দেখলাম…ভীড়ের মাঝখান দিয়ে ধাক্কা খেতে খেতে এগোচ্ছে…একজন বাপির বয়সী বা একটু বেশী হবে আর সাথের ছেলেটি হয়তো কুড়ি বাইশ হবে। খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। জানলার পাশে এসে ছেলেটা বোধহয় ওর বাবাকে কিছু একটা বলছিল…ততক্ষনে বাপিও ওদের কে দেখতে পেয়ে গেছে…হাত নেড়ে বাপি চেঁচিয়ে বলল…মেশোমশায়…এই তো আমরা…এই তিস্তা চল…ওরা এসে গেছে…

বাপি…তুমি না…ওরা শুনতে পাবে নাকি?

ওঃ…খুব ভুল হয়ে গেছে রে…খেয়ালই নেই আমরা এসি তে আছি।

বাপি উঠে ব্যাগ গুলো এক জায়গায় করতে করতে ওরা চলে এলো…ছেলেটা বেশ হ্যান্ডসাম হয়েছে তো…বেশ লম্বা…কি সুন্দর চোখ দুটো…একটু যেন দুষ্টুমিতে ভরা…ব্লু জিন্স আর লালের উপর সাদা স্ট্রাইপ টি সার্টে দারুন দেখাচ্ছে…ওর সাথে একবার চোখাচুখি হতেই মুখ নাবিয়ে নিলাম…বুকের ভেতরটা একটু যেন কেঁপে উঠল। দাদাই… বেশ খুশীর সাথে আমার দিকে তাকিয়ে বলল… তিস্তা? আমাদের সেই ছোট্ট তিস্তা…কত বড় হয়ে গেছিস… চিনতেই পারছি না।

হেসে বললাম… তোমাকে দেখে আমিও চিনতে পারিনি।

আর…পারবি কি করে… কত বছর পর দেখা।

বাপি আর দাদাই যেন ভুলেই গেছে আর কেউ আছে…খুশী যেন আর ধরছে না ওদের, দুজনেই বকে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে আর বোধ হয় কোনোদিন দেখা হবে না। এখনই সব কথা শেষ করতে হবে।

ছেলেটা পাশ থেকে বলল …বাবা আমি একটা কুলি নিয়ে আসছি…তোমরা বোসো। ভীড় কমে এসেছে…এবার যাওয়া যাবে…

ব্যাগ গুলো কুলির মাথায় তোলা হয়ে গেলে ট্রেন থেকে নামলাম…ছেলেটা বলল…বাবা তোমরা ধীরে সুস্থে এসো…এ ব্যাটা কুলির সাথে তোমরা দৌড়োতে পারবে না…আমি গাড়িতে থাকবো…বলেই কুলির সাথে হনহন করে এগিয়ে গেল।

বাপির হাত ধরে এগোচ্ছি… খুব অভিমান হচ্ছিল…কি অহ্নকারী ছেলেরে বাবা…একটুও পাত্তা দিলো না… সাথে করে তো নিয়ে যেতে পারতো…বাপির তো খেয়ালই নেই যে মেয়ে সাথে আছে…যাকগে ও পাত্তা না দিলে আমিও পাত্তা দেবো না…বয়ে গেছে আমার ওর সাথে কথা বলতে।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়ীর কাছে গিয়ে দেখা গেল…গাড়ী লক করা…ছেলেটাকে আশে পাশে দেখা যাচ্ছে না…বাপিরা তখোনো গল্প করতে ব্যাস্ত…এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম একটু দুরে একটা গাড়ীর আড়ালে দাড়িয়ে ছেলেটা আমার দিকে হাত নাড়িয়ে ইশারা করছে…প্রথমে কিছু বুঝতে না পেরে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার পর বুঝলাম…বলতে চাইছে সিগারেট খেয়ে আসছি… ঘাড় নেড়ে জানালাম…ঠিক আছে।

একটু আগে ছেলেটার উপর খুব অভিমান হচ্ছিল কিন্তু এখন আর সেটা নেই…হোক না দুর থেকে শুধু ইশারা করে কথা বলেছে…সে …যাই বলুক না কেন…

ছেলেটা একটু পরেই চলে এল…সিগারেটের গন্ধ যাতে না পাওয়া যায় তার জন্য বোধ হয় মুখে লবঙ্গের মতো কিছু একটা দিয়ে এসেছে…সবাই গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে এমন সময় বাপি বলল…এই যা…একেবারে ভুলে গেছি…আমাকে প্রাচি সিনেমার কাছে একটু যেতে হবে…আমার এক বন্ধু একটা জিনিষ দিয়েছে…পৌঁছে দিতে হবে। মেশো… চলো না…যাবো আর আসবো…বাপিরা চলে যাবার পর চুপ করে গাড়ীর সামনের সিটে বসে ছিলাম…ছেলেটা গাড়ীর পেছনে দাঁড়িয়ে। বুকের ভেতরে আবার সেই অভিমান দানা বাঁধছিল…আমি একা বসে আছি…আমার সাথে একবার তো কথা বলা উচিত…

লুকিং গ্লাস দিয়ে ছেলেটার দিকে চুরি করে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম…ছেলেটা আবার একটা সিগারেট খেতে খেতে নিচু হয়ে পেছনের স্ক্রীনের ভেতর দিয়ে তাকাতেই ওর সাথে চোখাচুখি হয়ে গেল…অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে একটু পরে আবার যেই তাকিয়েছি…ছেলেটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে…ভীষন লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে নিয়ে বসে থাকলাম…বুকের ভেতরের দ্রিম দ্রিম আওয়াজটা নিজেই শুনতে পাচ্ছি।

একটু পরেই ছেলেটা এসে ড্রাইভিং সিটে বসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল…তুমি তিস্তা…তাইতো? অবশ্য নতুন করে জিজ্ঞেস না করলেও চলতো…

নিজেকে কেমন যেন সামান্য হলেও দুর্বল লাগছিল ওর সাথে একা থাকতে…মুখ তুলে ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার মুখটা নীচু করে নিয়ে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বললাম…

আমি বাবাই…ভালো নাম…সৃজন…

জানি…

তুমি এত লজ্জা পাচ্ছো কেন…আমাকে দেখছিলে তো কি হয়েছে?

মোটেও তোমাকে দেখছিলাম না…একা একা বসেছিলাম তাই এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। তুমিই উলটে আমাকে চুরি করে দেখছিলে।

তাই? তো কি হয়েছে তোমাকে দেখছিলাম তো? তুমি ভীষন মিষ্টি দেখতে…তাই দেখছিলাম…

কথাটা শুনে আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না…সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিউরে ওঠার অনুভুতি…অনেকেই এর আগে একই কথা বলেছে কিন্তু আজ যেন মনে হল এভাবে এর আগে কেউ বলতে পারেনি… তার সাথে…একটু আগে যাকে খুব অহ্নকারী মনে হচ্ছিল…তার মুখ থেকে এত সহজ়ে এইটুকু সময়ের দেখা হলেও…বলে দেওয়া কথাটা যেন ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। নিজেও তেমন একটা লাজুক না হলেও…আর কিছু বলতে পারলাম না…

একটু পরে কিছু বলা উচিত ভেবে জিজ্ঞেস করলাম…তুমি আবার একটা সিগারেট খেলে কেন?

এই তুমি আবার মাকে বলে দিও না যেন আমি সিগারেট খাই…পিটিয়ে ছাতু করে ফেলবে…বাড়ী ফিরে তো আর সারাদিন চান্স পাবো না…তাই সুযোগ পেয়ে খেয়ে নিলাম…

ওর কথা বলার ধরন দেখে হাসি চেপে রাখতে পারলাম না…

আমাকে হাসতে দেখে বলল…এতে আবার হাসির কি আছে বুঝলাম না।

আবার হেসে ফেলে বললাম…এত বড় ছেলে মায়ের কাছে পিটুনি খায়…হাসবো না তো কি…

মায়ের কাছে ছেলেরা সব সময়ই ছোটো থাকে…প্লিজ মাকে বলবে না কিন্তু…

আমার বয়ে গেছে বলতে…ছেলেরা একটু আধটু সিগারেট খেলে ভালোই লাগে…

কিছুক্ষন দুজনেই চুপচাপ বসে থাকলাম…আর বলার মতো কোনো কথা হয়তো খুঁজে পাচ্ছি না দুজনেই।

মুখ নিচু করে ভাবছি…যা বলার জন্য এতদিন অপেক্ষা করে থাকার পরে এতদুর থেকে এসেছি সেটা বলতে গিয়ে বুকের ভেতরে আটকে যাচ্ছে কেন…মন চাইছে আরো কিছু বলতে…কিন্তু সেটা কি…নিজেই বুঝতে পারছি না…

বাপিরা একটু পরেই ফিরে এল। পেছনের সিটে বসে আগের মতোই বকবক করে যাচ্ছে। সৃজন পার্কিং এর টাকা মিটিয়ে দিয়ে গাড়ীর ইঞ্জিন চালু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল…এই…তিস্তা…তোমার সিট বেল্ট আটকে নাও।

সিট বেল্টটা কোথায় যেন আটকে ছিল…টানাটানি করেও বেরোচ্ছিল না দেখে ওর দিকে তাকালাম…ও নিজের সিট বেল্টটা খুলে আমার দিকে ঝুঁকে ডান হাত বাড়িয়ে বেল্টটা ধরে টেনে ছেড়ে দিয়ে আবার টানতেই ওটা বেরিয়ে এল। ওই করতে গিয়ে ওর হাতটা আমার বুকের উপর একটু ছুঁয়ে গেলে…বেল্টটা আটকে দিয়ে বলল…সরি…ইচ্ছে করে করিনি।

ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখ নিচু করে নিয়ে আস্তে করে বললাম…আমি কিছু মনে করিনি। যদিও ওইটুকু সময়ের আলতো ছোঁয়ায় কেমন যেন একটা করে উঠল মনের ভেতরে।
আমার বম্মা #

বাড়ী পৌঁছোবার পর ওর মা আমাকে জড়িয়ে ধরল…ও মা…তিস্তা…তুই কত বড় হয়ে গেছিস…তুই আমাকে চিনতে পারছিস?…বম্মা বলে ডাকতিস…

ঘাড় নেড়ে জানালাম…মনে আছে।

আমাকে পেয়ে বম্মা কি করবে যেন ঠিক করতে পারছিল না। মায়ের কান্ড কারখানা দেখতে দেখতে সৃজন বলল…মা…ওনারা ট্রেন জার্নি করে এসেছেন…একটু বিশ্রাম নিতে দাও।

তুই থাম তো…আমার মেয়েকে এতদিন পর পেয়েছি…আদর কোরবো না? নিজের মায়ের আদর কাকে বলে কোনোদিন বুঝিনি… বম্মাই আমার মা বলে ভেবে এসেছি এতদিন…বম্মার আদরে বুকের ভেতর থেকে এক দলা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছিল… সবার সামনে কাঁদতে গিয়ে পারলাম না। ওকে বলতে শুনলাম…ঠিক আছে…তুমি তোমার মেয়েকে আদর কর…আপত্তি নেই কিন্তু তোমার এই অভাগা ছেলেটার জন্য কিছুটা বাঁচিয়ে রেখো। এমন ভাবে কথাটা বললো যে আমিও বাকিদের সাথে না হেসে থাকতে পারলাম না।

বেশ কিছুক্ষন পর সবাই মিলে বসে গল্প করছি… বিচ্ছু ছেলেটা নাকি বাজারে গেছে… ভাবছি…খুব সংসারী হয়ে গেছে নাকি…কে জানে…দেখে তো মনে হল না। কিছুক্ষন পর বম্মা উঠে গেল… রান্নাবান্না শুরু করতে হবে। বাপিরা টিভি তে খবর দেখছে। একা একা কি করবো…ভেবে বম্মা কে গিয়ে বললাম… স্নান করে নেবো?

এই দেখো…মেয়ের কথা শোনো…স্নান করবি তো আবার আমাকে জিজ্ঞেস করার কি আছে। আচ্ছা শোন…গরম জল লাগলে গিজার টা চালিয়ে নিস। এমনিতে আমার স্নান করতে সময় লাগে …বারে বারে বিচ্ছু ছেলেটার কথা মনের ভেতরে এসে যাওয়াতে …আজ যেন আরো একটু বেশি লাগলো। স্নান হয়ে গেছে…কি করি ভাবতে ভাবতে বম্মার কাছে গেলাম…মাছ, মাংস, সব্জি… নিয়ে খুব ব্যাস্ত… ও বোধ হয় বাজার থেকে এসে গেছে। বম্মা আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল …কি রে … কি খেতে ভালোবাসিস… সব্জি খাসতো?

হ্যাঁ…কেন খাবো না… সব খাই… বাছাবাছির সু্যোগ আছে নাকি… রান্নার মাসী নিজের ইচ্ছে মতো রান্না করে…

সে কি রে… তুই কিছু বলিস না?

নিজে কিছু জানলে তো বলবো…

তা অবশ্য ঠিক… কে আর শেখাবে তোকে…

বেশ কিছুক্ষন বম্মার সাথে গল্প করার পর ইচ্ছে হচ্ছিল এক বার ওকে দেখতে…কোথায় আছে কে জানে… ভেবে বম্মা কে জড়িয়ে ধরে বললাম…বম্মা…তোমাদের বাড়ীটা একটু ঘুরে দেখবো?

ওমা মেয়ের কথা শোনো…তুই নিজেকে পর পর ভাবছিস কেন? এটা তোর ই বাড়ী…

বম্মা কে চুমু খেয়ে বললাম…একটু পরেই চলে আসছি কিন্তু…তোমার রান্না করা দেখবো…

বাবা এই কয়েক দিন আগে জ্বর থেকে উঠেছে…তার উপরে আবার সকাল সকাল উঠে স্টেশনে যেতে হয়েছে…বাড়ীতে গেস্ট…মায়ের ফর্দটা আজ বেশ লম্বা দেখে নিজেই বাজারে গেলাম এমন নয় এই প্রথম, মাঝে মাঝেই যেতে হয় যদিও বাবা পারতপক্ষে যতটা সম্ভব নিজে করে নেয় বাজার থেকে ফিরে এসে খেয়ে নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে একটা গল্পের বই নিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম…এখন আর কিছু করার নেই…মা রান্না ঘরে ব্যাস্ত, তিস্তাকে দেখতে পেলাম না, বাবা তিস্তার বাপির সাথে বসে গল্প করছে…কিছুটা পড়ার পর মন বসাতে পারলাম না… একটু অন্য মনস্কহয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলাম…জীবনে অনেক মেয়ের কাছাকাছি এসেছি কিন্তু কোনোদিন তো এরকম মনে হয়নি…ওর টানা টানা দীঘল কালো চোখে যেন কিছু বলার আর্তি…কিছু কি ও বলতে চায়? সেটাই বা কিভাবে সম্ভব…সবে মাত্র আজ সকালেই ওর সাথে দেখা…এত তাড়াতাড়ি কোনো মেয়ে তো কাউকে কিছু বলতে পারে না তাছাড়া বলবেই বা কি করে? ওদের সাথে নাকি আমাদের কোনো দিক থেকে আত্মীয়তা আছে হতে পারে আমি ভুল বুঝেছি…যা ভাবছি তা নয় কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভুতি বুকের মধ্যে নিয়ে পড়ার দিকে মন দেবার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না…বার বার তিস্তার চোখ দুটো মনের আয়নায় ছায়া ফেলতে লাগলো…কি সুন্দর মিষ্টি মুখটা…দেখলেই যেন আদর করতে ইচ্ছে করবে…সারা শরীরে যৌবন উছলে পড়ছে কিন্তু তা তীব্র কামনা না জাগিয়ে ভীষন ভালোলাগার এক অনুভুতিতে মন প্রান ভরিয়ে দেয়

প্রথম শিহরন #

খুব ইচ্ছে করছিল সৃজনকে একবার দেখার…বসার ঘরের দিকে না গিয়ে অন্য দিকে চলে গেলাম…ওখানে বাপিরা বসে আছে…এ ঘর ও ঘর খুঁজে কোথাও বিচ্ছুটাকে দেখতে পেলাম না… দোতলায় উঠে প্রথম ঘরটায় উঁকি দিয়ে ওকে দেখতে পেয়েই…বুকের ভেতরে আবার সেই সকালের মতো দ্রিম দ্রিম করে আওয়াজটা শুরু হয়ে গেল…

জিজ্ঞেস করলাম…আসবো?

ও ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার কাছে আমাকে কে দেখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল… হয়তো আমাকে স্নান করে নেওয়াতে আগের থেকে ফ্রেস দেখাচ্ছিল বলে ও তাকিয়ে আছে

লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিয়ে বললাম…ভেতরে আসতে বলবে নাকি চলে যাবো…

চলে গেলে তোমারই ক্ষতি…

মানে?

মানে…আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর চান্স মিস করবে…

খুব অহ্নকার না …তোমার…

একদম নয়…শুধু অহ্নকার নয়…মিশলে দেখবে আমার মতো পাজীর পা ঝাড়া ছেলেও আর নেই…

হাসি আটকাতে না পেরে বললাম…তুমি যে পাজী সেটা তোমার কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে…এত সময় তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি…এখোনো ভেতরে আসতে বললে না…তুমি বোধ হয়…

আরে না না…এসো…এমনিই… একটা গল্পের বই পড়ছিলাম…

ভেতরে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম…কার লেখা?

ও উঠে বসতে বসতে উত্তর দিল…সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের শ্বেতপাথরের টেবিল…আমার খুব ফেভারিট…

তাই…আমার ও ভীষন ভালো লাগে…অনেকবার পড়েছি…

আরে তুমি বোসো…দাঁড়িয়ে আছো কেন…

না বললে বসা যায় নাকি… 

খুব বসা যায়…নিজের মনে করলেই বসা যায়…

বিছানায় বসে ঘরটার এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বললাম…তোমাদের বাড়ীটা খুব সুন্দর …

বাড়ীটা সুন্দর হয়তো কিন্ত কিছু একটার অভাব ছিল … তুমি এসে সেই অভাবটা মিটিয়ে দিয়েছো…

ঠিক বুঝলাম না…কিসের অভাব ছিল…

একজন সুন্দর অল্প বয়সী মেয়ের অভাব ছিল… 

ওর দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে বললাম…আমি কি আর এমন সুন্দর…আমার থেকেও অনেক বেশী সুন্দরী মেয়ে আছে

তা হয়তো আছে…কিন্তু তোমার সৌন্দর্য ঠিক মোমবাতির আলোর মতো স্নিগ্ধ…অল্প উত্তাপ, জ্বলে যাবার ভয় নেই তাই এড়িয়ে যাওয়া ভীষন মুশকিল…আর তার সাথে…আছে…নীরব আহ্বান…কই এসো…আমার বুকে ঝাঁপ দাও…

তোমার অনেক বান্ধবী আছে…তাই না…

তা আছে…কিন্তু তুমি কি ভাবে বুঝলে?

নিজেকে একটু দুরে দুরে রেখে এরকম মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে পারে যে ছেলে…তার বান্ধবী থাকাটা খুব স্বাভাবিক…

ও একটু অবাক হয়ে আমার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল…তোমার এই একটু দূরে দূরে থেকে…কথাটার মানে কি বলোতো?

মানে…তুমি নিজেকে সহজলভ্য না করেও মেয়েদেরকে কাছে টেনে নিয়ে আসতে পারো…

আমি যে নিজেকে সহজলভ্য করিনা…বুঝলে কি করে?

আজ অব্দি আমি কোনো ছেলে দেখিনি…যারা কোনো না কোনো ছুতোয় মেয়েদের কাছে আসার চেষ্টা করে না…বা…ইম্প্রেস করার চেষ্টা করে না…তুমিই আমার দেখা একমাত্র ব্যাতিক্রম…

মাত্র তিন ঘন্টায় তুমি বুঝে গেলে যে আমি অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা? কিভাবে সম্ভব?

ও তুমি বুঝবে না, মেয়েদের একটা আলাদা বোঝার ক্ষমতা আছে…ছেলেদের চাউনি দেখলে বুঝতে পারে…

ও একটু উদাস হয়ে…জানলার দিকে তাকিয়ে বলল…তা…আমার এই স্বভাবটা কি ভালো…না কি খারাপ…

ওর কথা বলার ধরন দেখে হাসি পেয়ে গেল…মুখ টিপে হেসে বললাম…সাঙ্ঘাতিক ডেঞ্জারাস…মেয়েদের জন্য…

হুঁমম…আমার থেকে তোমার দুরে থাকাই ভালো…

একটা কথা জিজ্ঞেস কোরবো…কিছু মনে করবে নাতো?

মনে করার আবার কি আছে…

তোমার কি কোনো খুব কাছের বান্ধবী আছে? কথাটা জিজ্ঞেস করে বুকের ভেতরটা ভীষন ভাবে কাঁপছিল…ভগবান…ওর উত্তরটা যেন ‘না’ হয়… 

ও কিছুটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে যেন কিছু ভাবলো…তারপর আবার জানলার দিকে তাকিয়ে বলল…নাঃ…তুমি যা ভাবছো…তা নয়…আমার সেরকম কেউ নেই…মানে…সেভাবে কাউকে নিজের করে নেওয়ার মতো কারুর দেখা পাইনি…

নিজের বুকের ভেতরে অদম্য খুশী আটকে রেখে বললাম…আমার বিশ্বাসই হছে না…তোমার মতো ছেলে…এতদিন প্রেম না করে থাকতে পারে… 

সে তুমি যা খুশী ভাবতে পারো…আমার কাউকে ভালো লাগে নি সেভাবে…যদিও অনেকেই কাছে আসতে চেয়েছে…যদি কোনোদিন…কাউকে পাই…তোমাকেই আগে জানাবো…

আমাকে কেন জানাবে?

আমার ইচ্ছে…

তুমি খুব ঝগড়ুটে…মেয়েদের মতো… 

এটাও আমার আর একটা গুন…তাহলে মোট কটা হল বলোতো? তিনটে…অহ্নকার… মেয়েদের কাছে টানার ক্ষমতা…আর ঝগড়ুটে…আর কটা দিন থাকো…আরো বেরোবে এক এক করে…

সত্যিই ওর কথা বলার ধরনটাই এমন যে না হেসে পারা যায় না…হাসতে হাসতে বললাম…আরো একটা পেয়েছি…

কি?

তুমি খুব সহজেই মানুষের দুঃখ ভুলিয়ে দিতে পারো…জানো তো…সারা রাস্তা চিন্তা করতে করতে এসেছি…তোমরা আমাকে কেমন ভাবে নেবে…আসার পর বুঝতে পারছি…না এলে…কত কিছু না জানা থেকে যেত…কত কিছু না পাওয়ার ব্যাথা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হত… 

আমার তাহলে গুনের শেষ নেই বলো…এত গুন থাকতেও কেন যে একটা মেয়ে তুলতে পারলাম নাকে জানে?...সবই কপাল…বুঝলে…

চেষ্টা করলেই পাবে…

তাই নাকি…আমি তো জানি…প্রেম নিজেই এসে ধরা দেয়…

কখোনো কখোনো…প্রেম নীরবে এসে চলে যায়…বুঝতে যদি না পারো…সারা জীবন... প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে…আমার এই দুয়ার প্রান্তে…আমি পারিনি তা জানতে…গাইতে হবে…

তোমার গলা খুব মিষ্টি…একটা গান শোনাবে?

উঁ হুঁ…এখন আমার তোমার সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করছে… 

আচ্ছা…এবার তোমার কথা বলো…মানে তোমার বয়ফ্রেন্ড কেমন…কি করে…কতদিন ধরে তোমরা প্রেম কোরছো…তোমার বাপিকে জানিয়েছো কিনা…

হেসে ফেলে বললাম…বাব্বাঃ…এক সাথে এত গুলো প্রশ্ন…উত্তর দিই কি করে…

ঠিক আছে…একটা একটা করে উত্তর দাও…

আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই…নেই যখন…কি করে…বা…কতদিন প্রেম করছির কোনো উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না…

অসম্ভব…তোমাদের ওখানকার ছেলে গুলোর কি চোখ নেই নাকি? নাকি…তুমি বোরখা পরে রাস্তায় বেরোও?

চোখ থাকবে না কেন…রাস্তায় বেরোলে মনে হয় যেন গিলে খাবে…আসলে আমার কপালটাও তোমারই মতো…কাউকে মনেই ধরে নি…

যাঃ…বাজে বোকোনা…

সত্যি…বিশ্বাস কর…

ঠিক আছে…বিশ্বাস করলাম…এক কাজ করা যাক…আমরা দুজনে একটা করে ছেলে আর মেয়ে খুঁজি…আমারটা তুমি ঠিক করে দাও…আর আমি তোমার টা…

না বাবা…এই বেশ ভালো আছি…তুমি যদি আমাকে এখন তোমাদের বাড়ীটা ঘুরিয়ে দেখাও তাহলেই আমি খুশী…

ও চোখ ছোটো ছোটো করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল…কেন… আমার সাথে বসে গল্প করতে ভালো লাগছে না? এই যে বললে…আমার সাথে গল্প করবে…

তুমি না সত্যিই ভীষন বিচ্ছু…তোমার সাথে গল্প কোরবো বলেই তো এলাম… আমি বম্মাকে বলে এলাম যে তোমাদের বাড়ীটা ঘুরে দেখবো…সেটা না করে তোমার সাথে গল্প করতে দেখলে কি ভাববে…তাই না? 

হুঁমম…সৌন্দর্যের সাথে সাথে বুদ্ধি ও আছে…যার কপালে আছো…তার ভাগ্যটা সত্যিই ভালো…এই অভাগার ভাগ্যে আবার কি আছে কে জানে…চলো…তোমাকে বাড়ী দেখাই…

দোতলার সব ঘরগুলো দেখার পর…দুজনে ছাদে গেলাম…ছাদের বাগানটা দেখে ভীষন ভালো লাগছিল…কত রকমের ফুল ফুটে আছে…নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম…ইস…কি সুন্দর ফুল ফূটে আছে…কে দেখাশোনা করে গো? কথাটা বলেই খুব লজ্জা পেয়ে গেল…মুখ নিচু করে ভাবছিলাম…ইস…কি ভাবছে ও


ও আমার অবস্থা দেখে হেসে বলল…থাক আর লজ্জা পেতে হবে না…আমি কিছু ভাবিনি…

অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলাম…ঠিক বোলছো…

ও আমার হাতটা ধরে বলল…চলো…ওদিকে আরো কিছু ফুলের গাছ আছে…

সারা শরীরটা এক অজানা শিহরনে কেঁপে উঠল…অস্ফুট স্বরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললাম…প্লিজ ছাড়ো…কেউ দেখে ফেলবে…

0 Comments: